প্রসঙ্গ গিগকর্মী: ইতিহাসের পথ ধরে (পঞ্চম পর্ব)

Author
চন্দন মুখোপাধ্যায়

Context Gig Worker: Along the Path of History

পঞ্চম পর্ব

সরকারের অমানবিক ভূমিকাও কোর্টের নির্দেশ:
বিভিন্ন রাজ্য এখন ভাবনা চিন্তা শুরু করেছে, কিন্তু গুরুত্ত দিয়ে এগিয়ে যাওয়া কোনো রাজ্যেই বিজেপি শাসিত রাজ্য নয়।কেন্দ্রে বা রাজ্যগুলোতে বিজেপি কিন্তু এক পাও এগোয়নি।এর পিছনে পুঁজির মালিকদের কতটা ভূমিকা সেটা আলোচনায়  আসতেই পারে।ঠিক যেমনটি আমাদের রাজ্যে।এই নিয়ে কোনো বিল আনাতো দুরস্ত কোনো ভাবনাও আজ পর্যন্ত প্রাকাশিত  হয়নি।সরকারি শূন্যপদগুলি পূরণ না করে সব জায়গায় কেন্দ্র এবং আমাদের রাজ্য অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক কর্মী দিয়ে সবটা  চালানোর চেষ্টা হচ্ছে।এটা আজকের চরম বেকারত্বের যুগে শুধু অমানবিক নয় বোধয় আইনের চোখেও অন্যায়।সুপ্রিম কোর্ট একটি রায়ে বলেছে যে সরকার, দেশের অন্যতম বৃহত্তম নিয়োগকর্তা, গিগ অর্থনীতির উত্থানের সাথে বেসরকারী খাতে দেখা "অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ব্যবস্থা" অনুকরণ করা উচিত নয়।

“বেসরকারি খাতে, গিগ অর্থনীতির উত্থানের ফলে অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ব্যবস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রায়শই সুবিধার অভাব,  চাকরির নিরাপত্তা এবং ন্যায্য আচরণের দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। শ্রমিকদের শোষণ এবং শ্রমের মান ক্ষুণ্ন করার জন্য এই  ধরনের অনুশীলনের সমালোচনা করা হয়েছে। ন্যায্যতা এবং ন্যায়বিচারের নীতিগুলি সমুন্নত রাখার জন্য সরকারী  প্রতিষ্ঠানগুলি, এই ধরনের শোষণমূলক কর্মসংস্থানের অনুশীলনগুলি এড়াতে আরও বড় দায়িত্ব বহন করে, "বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং পিবি ভারালের একটি বেঞ্চ সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে বলেছেন।

পাবলিক সেক্টরের সংস্থাগুলির দ্বারা "অস্থায়ী" চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের শোষণ এবং অপব্যবহার শুধুমাত্র একটি গিগ  অর্থনীতিতে পরিলক্ষিত ক্ষতিকারক প্রবণতাগুলিকে প্রতিফলিত করে না বরং এটি একটি উদ্বেগের জন্ম দেয়, বিচারপতি নাথ, যিনি রায় দিয়ে,সতর্ক করেছেন।

সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশনে নিযুক্ত পরিচ্ছন্নতা ও বাগান কর্মীদের দায়ের করা আপিলের ভিত্তিতে ২০২৪ এর  20 ডিসেম্বরে রায় দেওয়া হয়েছিল৷ সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল এবং দিল্লি হাইকোর্ট সম্মত হয়েছে যে তারা  শুধুমাত্র খণ্ডকালীন কর্মী ছিল যারা অনুমোদিত পদের বিপরীতে নিযুক্ত হয়নি এবং নিয়মিতকরণের মানদণ্ড পূরণ করার জন্য পূর্ণ-সময়ের পরিষেবা সম্পন্ন করেনি। এ ছাড়া, দুই ফোরাম বলেছে, নিয়মিতকরণকে অধিকারের বিষয় বলে চাওয়া যাবে না।এরপর ওদের বরখাস্ত করা হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে  শীর্ষ আদালত তাদের কাজ থেকে বরখাস্ত না করা এবং তাদের অবিলম্বে নিয়মিত করার নির্দেশ দিয়েছে।

বিচারপতি নাথ বলেছিলেন যে আদালতগুলিকে "সারফেস লেবেল" এর বাইরে দেখা উচিত এবং কর্মসংস্থানের বাস্তবতাগুলি বিবেচনা করা উচিত: অবিচ্ছিন্ন, দীর্ঘমেয়াদী পরিষেবা, অপরিহার্য দায়িত্ব এবং তাদের নিয়োগে কোনও অবৈধতার  অনুপস্থিতি।“বড় কর্পোরেশন ক্রমবর্ধমানভাবে অস্থায়ী কর্মচারী বা স্বাধীন ঠিকাদার নিয়োগের অভ্যাস গ্রহণ করেছে  কর্মচারী সুবিধা প্রদান এড়াতে, যার ফলে তাদের লাভ বৃদ্ধি পায়। এই রায়টি এই নীতির উপর জোর দেয় যে কর্মীর জন্য  নির্ধারিত লেবেলের পরিবর্তে সম্পাদিত কাজের প্রকৃতির দ্বারা কর্মসংস্থানের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অধিকার এবং সুবিধাগুলি নির্ধারণ করা উচিত ।এটি একটি বিরক্তিকর বাস্তবতা যে অস্থায়ী কর্মচারীরা, বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে, প্রায়শই  বহুমুখী শোষণের ও সমস্যার সম্মুখীন হয়। ” রায়ে , ভিজকাইনো বনাম মাইক্রোসফ্ট কর্পোরেশনের মার্কিন  আদালতের আপিলের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে ।

আদালত বলেছে যে ভারত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, যেটি ক্রমাগতভাবে কর্মসংস্থানের  স্থিতিশীলতা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য আচরণের পক্ষে কথা বলেছে, বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে যেখানে চাকরি বন্ধ করা  দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্বকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

“বর্ধিত সময়ের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মীদের নিযুক্ত করা, বিশেষ করে যখন তাদের ভূমিকা সংস্থার কার্যকারিতার সাথে অবিচ্ছেদ্য হয়, তা কেবল আন্তর্জাতিক শ্রমের মানকে লঙ্ঘন করে না বরং সংস্থাটিকে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে এবং  কর্মীদের মনোবলকে ক্ষুণ্ন করে। ন্যায্য কর্মসংস্থানের অনুশীলন নিশ্চিত করার মাধ্যমে, সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলি অপ্রয়োজনীয় মামলা-মোকদ্দমার বোঝা কমাতে পারে, চাকরির নিরাপত্তাকে উন্নীত করতে পারে এবং ন্যায় ও ন্যায্যতার নীতিগুলিকে  সমুন্নত রাখতে পারে যা তারা মূর্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে” বিচারপতি নাথ পর্যবেক্ষণ লিখিত ভাবে রেখেছেন ।

 

পরিশেষে:
আজ প্রতিদিন বেড়ে চলা বেকারত্বের যন্ত্রনা থেকে জন্ম হচ্ছে কোটি কোটি শিক্ষিত গিগ কর্মীবাহিনী। তাই আজ নতুন করে দাবী উঠছে, আগে জনগণনার প্রশ্ন পাল্টাক কেন্দ্র। ঘরে-ঘরে জিজ্ঞাসা করা হোক, কাজ আছে কি না।  থাকলেও তাঁরা অন্য  কাজের চেষ্টা করছেন কি? করলে, কেন? এখনকার কাজে কি হেঁশেল চলে না? তার ভিত্তিতে তৈরি হোক প্রাথমিক তালিকা।’ এনআরসি নয়, এনআরইউ (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব আনএমপ্লয়মেন্ট বা জাতীয় বেকারত্ব পঞ্জি) তৈরিই এখন দিল্লির পাখির চোখ হওয়া উচিত।ভোটার তালিকা, রেশন কার্ড, আধার, জনগণনা— বিভিন্ন সূত্রে আমজনতার তথ্য সরকারের ঘরে  আছে ঠিকই। কিন্তু দেশে কাজের বাজারের ছবি ঠিক কেমন, তার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না এর কোনটি থেকেই। যেমনটি নেই গিগ কর্মীদের  সঠিক সংখ্যা ,তথ্য এবং সামগ্রিক চিত্র। কেন্দ্র ও রাজ্যসরকারের এই গিগ কর্মীদের জন্যে কোন  মাথাব্যথাই নেই। কেন আজও গিগ কর্মীদের জন্যে আইন করে অধিকার দেওয়া হবে না? খেলা,মেলা,উৎসবে সরকারি  টাকার শ্রাদ্ধ হলেও, ওদের জন্যে কিছু ভাবা হবে না কেন? নতুন পদ সৃষ্টি তো দুরস্ত  লক্ষ লক্ষ সরকারি শূন্যপদ ফেলে রেখে কেন বেকার যুবকদের ঠেলে দিচ্ছে অস্থায়ী কাজের জগতে? বেকারদের জীবনের  অধিকারের লড়াই তাই শুধু আজ  শ্রমিক বা যুবদের  নয়। গোটা দেশের সাধারণ মানুষের। আজ তাই  সবার কণ্ঠে আওয়াজ উঠুক বেকারত্বের বিরুদ্ধে  আর তার থেকে জন্ম নেওয়া নব্য যন্ত্রণার অন্য নাম গিগ কর্মীদের জন্যে,যারা দিন রাত এক করে মুখের রক্ত তুলে আমাদের ঘরে  সব কিছু পৌঁছে দিচ্ছে সামান্য রোজগারের তাগিদে।
আর কাজের শেষে আমাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত - যন্ত্রনাবিদ্ধ  করুন মুখে কোন অর্থ নয়,সাহায্য নয়, শুধু চায়, "একটু 5 ষ্টার দেবেন প্লিজ?"


প্রকাশ: ০৪-এপ্রিল-২০২৬

আপনার মতামত

এই লেখাটি সম্বন্ধে আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।

This Is CAPTCHA Image

শেষ এডিট:: 12-Mar-26 16:08 | by 3
Permalink: https://cpimwestbengal.org/context-gig-worker-along-the-path-of-history -part-5
Categories: Fact & Figures
Tags:
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:



লেখক/কিওয়ার্ড